অপাঙ্ক্তেয় এক বর্ণের গল্প

194

পরিবার-পরিজনের সম্মতিতে বিয়েটা ধুমধাম করে সেরেছিলো সুজাতা ও অর্ক। দুজনের পাঁচ বছরের প্রেমে কোনো খামতি ছিলো না, আদরে সাদরে কানায় কানায় পূর্ণ ছিলো তাঁদের ভালোবাসার জলসাঘর। আঁধারে আলো জ্বালিয়ে, বর্ষায় সূর্যস্নানে ভাসিয়ে, কনকনে শীতে উত্তাপ ছড়িয়ে প্রেমোপাখ্যানের দীপাবলি রচনা করলো এ মিহি জুটি, এ যেনো মধুরেণ সমাপয়েৎ। তাঁদের আনন্দের মাত্রায় চাঁদের হাট বসালো ফুটফুটে লাল টুকটুকে সোনামণি বর্ণ। উন্নত জীবনের আশায় পূর্ণিমাতিথিতে জীবন বন্দরে নোঙর ফেলে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকানো বর্ণের অমোঘ মায়া ও শান্তির পাতকুয়া সুজাতাহীন অর্ক দুবছর ধরে পরবাসী। বর্ণের আধো আধো স্বরে বাব্বা বাব্বা ডাক শুনলে IMO’র প্রান্ত বেয়ে অর্কের কলিজা কিলবিল করে ওঠতো, মনে হতো হাজার হাজার মাইল নিমিষে তুড়ি মেরে ছুটে এসে বুকে লেপ্টে গিয়ে বর্ণের সারা শরীর চুমোতে চুমোতে ভরিয়ে দিই। তা আর হলো কই, এরই মধ্যে অস্তিত্ব রক্ষার টানাপড়েন শুরু হলো সুজাতা ও অর্কের। অল্পস্বল্প সন্দেহ ও অবিশ্বাস বিশাল স্তূপাকারে রূপ নিয়ে তাঁদের সম্মান ও ভক্তির ইস্পাতদৃঢ় দেয়ালে উপর্যুপরি আঘাত করতে লাগলো এবং ভাঙতেও শুরু করলো শেষমেশ। চোখের পলকে অর্কের কাছে দেবীতুল্য সুজাতা হয়ে ওঠলো এক মহা চরিত্রহীনা খলনায়িকা। পাঁচ বছর বাদে অনাড়ম্বরভাবে একগাদা মনোবেদনা নিয়ে দেশের মাটিতে পা ফেলে এদিকসেদিক না তাকিয়ে উকিল বন্ধুর শরণাপন্ন হয়ে ডিভোর্স সংক্রান্ত যাবতীয় তালিম সঞ্চয় করে বাড়ি ফিরলো অর্ক। ঔরসজাত ফাইভ বছর প্লাস বর্ণ আআব্বু বলে ঘাড়ে বাংলা কদুর লাহান লটকে গিয়ে বহু বছরের প্রতীক্ষিত বাবার গায়ের মিষ্টি গন্ধ শুঁকতে লাগলো, তা একসময়ের সুপ্রিয়া সুজানা অন্তঃপুরে দরজার কোণায় ড্যাবড্যাব সজল চোখে দাঁড়িয়ে হা করে অবলোকন করতে থাকলো নির্মোহভাবে। সেদিন সুজানা অর্কের কোনো আলাপচারিতা হয়নি, আলাদা আলাদা কামরায় একই ছাদের নিচে শোয়েছিলো দুজন তবে সেদিনের রাতটুকুন বর্ণ তার বিদেশি বাবার সাথেই ছিলো অপ্রতিভভাবে। ‘মচকাবে তবু ভাঙবে না’ এই প্রবাদটি মিথ্যে প্রমাণিত করে সুজাতা-অর্কের সাধনার সংসার ঠিকি ভেঙেছে। পরেরদিন ধলপহরে বিছানাচাদর ছেড়ে গাট্টি-বুঁচকা গুটিয়ে বর্ণের হাত ধরে বাপের বাড়ির উদ্দেশে সুজাতার যাত্রা করাতো তাই বলে। ডিভোর্স বিষয়ক দাপ্তরিক সব কাজকর্ম তড়িঘড়ি করে সেরে অর্ক বিচ্ছেদময় ভালোবাসার সাতকাহন রচনা করলো নিজেই। বছর দুয়েক পরে মা-বাবার মনরক্ষার্থে অর্কের মরা গাঙ্গে আরেক সুনয়নীর ঠাঁই হলো, ঐদিকে পরিবারের চাপের মুখে কোনো গত্যন্তর না দেখে সুজাতাও অন্যত্র গাঁটছাড়া হয়ে গেলো বিধির নিয়মে। যার ধরুণ আল্লাহর দুনিয়ায় বর্ণের আপনজন বলতে আর কেউ রইলো না, মা-বাবা থাকা সত্ত্বেও সে আজ এক নিঃসঙ্গ এতিম। অবশেষে ক্লাস ফোরে পড়া বর্ণের মাথাগোঁজার আশ্রয় হলো কোন এক স্কুলের চারদেয়ালের কংক্রিটের হোস্টেলে, যেখানে পরম মমতায় মায়ের মনভোলানো আদর ও বাবার স্নেহময় শাসন আপাত অবিশ্বাস্য। কালেভদ্রে সুজাতা ও অর্ক মুঠোফোনে তাঁদের যাতনার অগ্নিসাক্ষী বর্ণের সাথে গোটাদুয়েক বাক্যবিনিময় করে পিতৃত্ব-মাতৃত্বের দায়িত্বটুকু ঝালাই করে নেন। দেখতে দেখতে একাকী বর্ণ এ+ পেয়ে জেএসসির চৌকাঠ পেরিয়ে নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছে। নিঃস্ব হোস্টেল জীবনের পঞ্চম বছরে যথারীতি তার নানাভাই(মায়ের বাবা) এসে গার্ডিয়ান অ্যাটেনডেন্স কলামে সাইন করে পাকাপোক্ত করে গেলো বর্ণের নিঃসঙ্গতার আরো একটি বছর। হয়তো একদিন হুট করে বর্ণ স্রষ্টার কাছে জিজ্ঞেস করে বসবে, হে খোদা, আমার কীই এমন দোষ ছিলো?

“দুঃস্বপ্নের এই প্রহরে আমি রবো অরুণোদয়ের ভরসায়।” বোধ হয় বর্ণ মনেমনে এই আপ্তবাক্যটি পুরোপুরি ধারণ করে দিনগুজার করছে।
নয়তো বর্ণরা কিসের আশায় বেঁচে থাকবে, বলুন!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here