ইয়াবার ভরা যৌবনে টেকনাফ!

72

সম্পাদকীয় নিউজ:

আজ ২৬ জুন আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য, ‘ মাদক বিষয়ে হই সচেতন, বাঁচাই প্রজন্ম, বাঁচাই জীবন’। জাতিসংঘ কর্তৃক নির্ধারিত এ দিবসটি উপলক্ষে বছরের এ দিনে দেশে দেশে সভা, সেমিনার ও বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে সচেতনামূলক র্যালি বের করে উদযাপন করবার রেওয়াজ রয়েছে। সংগত কারণে এ দিনটি বাংলাদেশের জন্য অনেক গুরুত্ববহ। সমান্তরালভাবে নদী নাফ ও পশ্চিমের টারশিয়ারি পাহাড়ের সম্মিলনে সর্বদক্ষিণের অনন্য আকর্ষণের ভৌগোলিক স্থান টেকনাফের জন্য গুরুত্ব তো তারও বেশি। মিয়ানমার, চিন ও ভারতের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু সীমান্ত জনপদ টেকনাফে মাদকের আগ্রাসনের খবর দেশব্যাপী চটকে আলোচনার বিষয়। বলা চলে পর্যটক আকৃষ্ট, অর্থনীতির হটস্পট, সুজলা সুফলা ও শান্তিপূর্ণ টেকনাফ গত ১৫ বছর ধরে ইয়াবার করালগ্রাসে বিপর্যস্ত এক লোকালয়ের নাম।
মিয়ানমারের সাথে সীমানা তথা ট্রানজিট থাকবার সুবাদে টেকনাফের চোরাচালানের ইতিহাস বহু পুরোনো হলেও ইয়াবার মতো এতো বিধ্বংসী মাদক এ-র পূর্বে কোনোকালেই দেশের মানুষ দেখেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে সরকারের হাইকমান্ড এ মরণ নেশা ইয়াবা নিয়ে অতীব চিন্তিত। টেকনাফ-উখিয়া বা কক্সবাজার এমনকি চট্টগ্রামের কোনোকোনো জায়গা থেকেও ইয়াবার চালান খালাস হবার খবরে প্রশাসনের চক্ষু চড়কগাছ। বানের জলের মতো ইয়াবার চালান সামাল দিতে প্রশাসনের রীতিমতো জান বের হবার অবস্থা। ইয়াবার উৎস ভূমি মিয়ানমারের তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা তো নেই, উল্টো তাদের কাগুজে আশ্বাস মাঝেমধ্যে হাস্যকর ঠেকে। এক পরিসংখ্যানে এসেছে বিজিবির বাৎসরিক বাজেটের দ্বিগুণ এবং পুলিশের বাৎসরিক বাজেটের অর্ধেক বাংলাদেশের টাকা ইয়াবার কারণে মিয়ানমারে প্রতিবছর পাচার হয়। এবং দেশের প্রায় ৮০ লক্ষ মাদকাসক্তের কারণে ঘরে ঘরে আজ হাহাকার, অশান্তি বিরাজমান। এক প্রতিবেদনে এসেছে এপর্যন্ত খালি ২০০ জন পিতামাতা মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে নির্মমভাবে খুন হয়েছেন। বাড়ছে আত্মহত্যার সংখ্যা। বাড়ছে সোস্যাল এনার্কি। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি থেকে শুরু করে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মাদকের ভয়াবহতা চোখ কপালে উঠবার মতো। বুলেট গতিতে বাড়ছে মাদকের ডিমান্ড। হরেকরকম মাদকদ্রব্য এভেলেবল থাকলেও ইয়াবার দখলে গোটা মার্কেট।
একসময়ের মানবিক, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শক্ত ভিতের ওপর প্রোথিত সমাজব্যবস্থা মাদকের ভয়াল থাবায় আজ ভেঙে খানখান হয়ে গিয়েছে। মা-বাবার প্রতি সন্তানের কদর নেই। বড় জনের প্রতি ছোটজনের শ্রদ্ধাবোধ নেই। নেই শিক্ষকের ছাত্রের অকৃত্রিম মান্যতা। গোটা সমাজ চলছে একটা খাপছাড়া গোছের হয়ে। এ দৃশ্যটি টেকনাফের পাড়ায় মহল্লায় একটু ঢুঁ মারলে খুব ভালোভাবে ঠাহর করা যায়। এককথায় বর্তমানে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবিদের চলছে অভূতপূর্ব রামরাজত্ব। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন থেকেও না-ই এমন একটি অবস্থা। অবশ্য অধিকাংশ জনপ্রতিনিধি নিজেরাই মাদক ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট।
২০১৮ সালে মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স ঘোষণা করবার পর টেকনাফ তথা কক্সবাজার পুলিশ প্রশাসন কঠোর অবস্থান নেবার পর অনেক মাদক ব্যবসায়ী ক্রসফায়ারে মারা যায়। অনেকে আত্মগোপনে চলে যায়। শীর্ষস্থানীয় ১০২ জন মাদক কারবারি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। সেসময়ে মাদক ব্যবসার জোয়ারে কিছুটা ভাটা পড়লেও, সিনহা ট্র্যাজেডির পর কক্সবাজার পুলিশ প্রশাসনে আস্থার সংকট দৃশ্যমান হলে গোটা কক্সবাজার পুলিশ ইউনিটের রদবদল ঘটে। এ মোক্ষম সুযোগটি ছোটোবড়ো, মাঝারি সকল মাদক কারবারিদের জন্য বয়ে আনে ত্রাহিত্রাহি ভাব। একেবারে শতভাগ ইফোর্ট নিয়ে তারা আবারো ঝাঁপিয়ে পড়ে ইয়াবা ব্যবসায়। আত্মগোপনে থাকা, জেলে থাকা কিংবা ১০২ জন আত্মসমর্পণ করা সবাই একে একে বের হয় এলাকায় এলাকায় মাদক সাম্রাজ্য পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে।
মাদকের আগ্রাসন থামাতে হলে সাপ্লাই কাট নীতির সাথে ডিমান্ড কাট পলিসিও পাশাপাশি রাখতে হবে। সীমান্ত সনাতন পদ্ধতিতে দায়সারাভাবে চলতে থাকলে হবে না। সীমান্ত কাঁটাতারের বেড়া দেবার কথা বললেও কাজ এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ইয়াবা পাচার প্রশমিত করতে নাফনদীতে ৩ বছর ধরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলেও, তার কোনো উপকারি রেজাল্ট সরকার পেয়েছে বলে মনে হয় না। সুতরাং বিজিবি, পুলিশ, র্যাব, কোস্টকার্ড অর্থাৎ যে সংস্থাগুলো মাদক নির্মূলে কাজ করছে, তাদের ভেতরে শতভাগ আন্তরিকতা জাতির সামনে দৃশ্যমান করে ইনোভেটিভ উপায়ে মাদকের শেকড় সমূলে উৎপাটন করতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here