জীবন যুদ্ধে হার না মানা মণির জীবনের গল্প

77

ডেস্ক রিপোর্টঃ

রংপুরের দক্ষিণ বাবুখা অঞ্চল। ১৯৯৮ সালের ১২ই মে; পৃথিবীর বুকে জায়গা করে নিলো এক নতুন মুখ। জন্ম নিলো এক ফুটফুটে মেয়ে শিশু। সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে জন্মগ্রহণ করা সেই মেয়েটি বা মেয়েটির পরিবার, কেউই তখন জানতো না, কোনো এক অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা কেড়ে নিবে মেয়েটির দৃষ্টিশক্তি।
মাসুদা আক্তার (মণি)। বর্তমানে অধ্যয়নরত আছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এর সমাজতত্ত্ব বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে। নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন সময়ে সে হারিয়েছিল তার দৃষ্টিশক্তি। কোনো প্রাকৃতিক কারণে নয়, সে শিকার হয়েছিল এসিডের। নির্মম হৃদয়ের ক্ষোভ কেড়ে নিয়েছিল তার চোখ। কিন্তু কেড়ে নিতে পারে নি স্বপ্ন। মণি পিছপা হয় নি, থামিয়ে দেয় নি নিজের পথচলা। দৃঢ়তায় সে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে নিয়ে এসেছে এতদূর, আরও এগিয়ে যাবে বহুদূর।
দুরন্ত, হাসিখুশি মণি ছিল বড় দুই ভাইয়ের অতি আদূরে। তার বাবা তখন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, আর মা সামলাতো ঘরের কাজ। মণির যখন মাত্র ছ’বছর বয়স, তখনই তার বাবা এ দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে যাওয়ায় মা’কে তখন ধরতে হয় সংসারের হাল। সংসার চালাতে চাকরি নেন একটা ব্যাগ কোম্পানিতে। বন্ধ হয়ে যায় বড় ভাইদের পড়াশুনা। কিন্তু মণির পড়াশেনায় আঘাত আসতে দেন না তারা কেউই। পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত তার পড়াশোনা চলে রংপুরের মুলাটোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর সে ভর্তি হয় সেনপাড়ার সমাজকল্যাণ বিদ্যাবিথি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। ঢাকার মির্জা আব্বাস মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর সে ভর্তি পরীক্ষা দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা এবং জাহাঙ্গীরনগরে চান্স না পাওয়ার পর যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সে চান্স পেয়ে যায়, তখন আর অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে সে পরীক্ষা দেয় নি। সে চট্টগ্রামেই ভর্তি হয়ে যায়।
জীবনের গল্পটাতে সুখ-দুঃখের এক অদ্ভুত মেলবন্ধন সবসময়ই থাকে। নিষ্কণ্টক নয় আসলে কারোরই পথচলা। মণির চোখ নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সে ভেবেছিল আর হয়তো তার পড়াশোনা হবে না, কেননা সে বা তার পরিবারের কেউই তখন এটা জানতো না যে, অন্ধরাও পড়াশোনা করতে পারে। ব্রেইল সম্পর্কে ছিল না তাদের কোনো ধারণাই। কিন্তু সেই সময় মণির এক বান্ধবী তাদেরকে বের করে নিয়ে আসে এই বিশাল ভ্রান্ত ধারণা থেকে। আশা জাগায় মণির মধ্যে, মণির পরিবারের মধ্যে। কষ্ট হলেও মণি যেন থেমে না যায়, সেই উদ্যম তার মধ্যে জেগে উঠে সাবলীলভাবে।
মণির চোখ নষ্ট হয়েছিল এসিড নিক্ষেপের শিকার হওয়ার কারণে। আর সেই এসিড নিক্ষেপ করেছিল মণিদের নিজেদের বাড়ির জমির মালিকের ছেলে, আলাল। মণির মা মণির ভালোভাবে দেখাশোনা করতে শহরে ভাড়া বাসা নিয়ে থাকতেন। কিন্তু নিজেদের পায়ের নিচের মাটিটা শক্ত করতে জমানো কিছু টাকা দিয়ে তিনি গ্রামের দিকে একটু জমি কিনে সেখানেই ছোটখাটো একটা বাড়ি তৈরী করেন। কিন্তু সেই শান্তির নীড়ের শান্তি নষ্ট করে দেয়ার জন্য সেই মালিকের ছেলেই যথেষ্ট হয়েছিল। মণি সে সময় ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তো। আলাল তখন অষ্টম শ্রেণীতে। মণিদের বাড়ির একটা বাসা পরেই ছিল সেই মালিকের বাড়ি, আর যাতায়াতের জন্য ঐ মালিকের বাড়ির সামনের রাস্তাটাই ব্যবহার করতে হতো মণিদেরকে। সেই সুবাদে যাওয়া আসার পথে মণিকে দেখতে পেতো আলাল, সাথে বিরক্তও করার সুযোগ পেতো। মণির এক বড় ভাইয়ের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার মাধ্যমে আলাল একসময় মণিদের বাড়িতেও যাতায়াতের পথ সুগম করে নেয়।
হঠাৎ একদিন ঐ ছেলে মণিকে একটা চিঠি দিয়ে বসে, আর মাত্র তিনদিনের সময় দেয় উত্তর দেবার জন্য। মণি ঘাবড়ে যায় সাথে সাথে সে তার মা’কে সবকিছু জানায়। তিনদিন পর আলাল মণিদের বাড়ি গেলে মণির মা ভালোভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়ে সে সময়কার জন্য বিষয়টা নিয়ন্ত্রণে আনে। যেহেতু মণি এবং আলাল দুজনই ছোট তখন, তাই মা এই কথা বলেন যে, তারা বড় হলে পারিবারিক ভাবে বিষয়টা নিয়ে যেন আলোচনা করা হয়। এসবের পরেও মণিকে রাস্তাঘাটে ছেলেটা বিরক্ত করেই গিয়েছিল। এভাবেই কেটে যায় কয়েক বছর।
মণি যখন নবম শ্রেণীতে পড়ে, তখন মণির জন্য একটা ভালো বিয়ের প্রস্তাব আসে। মণির জন্য বিয়ের কোনো প্রস্তাব আসলে সেটা যেন গোপন থাকে সেই চেষ্টাই করে থাকতো সবসময় মণির পরিবার। কিন্তু সেবার কিভাবে যেন বিষয়টা জানজানি হয়ে গিয়েছিল। তখন রমজান মাস। রাতের খাওয়া দাওয়া শেষে মা মেয়ে দুজনই শুয়ে পরেছিলো। ভাইয়েরা চাকরী থেকে একটু রাত করে ফিরতো।
হঠাৎ মণি দেখতে পেল জানালার বাইরে একটা আগুনের ঝলক জ্বলেই সাথে সাথে নিভে গেল। সে ভেবেছিল আকাশ খারাপ হয়তো। তার মাকে জিজ্ঞেসও করেছিল আকাশের অবস্থা কি খারাপ কিনা। কিন্তু আবারও একইরকম আগুনের ঝলক দেখে তারা দুজনই অবাক হয়েছিল ভীষণ। হঠাৎ মায়ের ফোন বেজে উঠে, মা কলটা রিসিভ করতেই ফোনের ওপাশ থেকে আলালের গলা শুনতে পায়। আলাল মা’কে এই বলে হুমকী দেয় যে, সে মা মেয়ে দুজনের দেমাক ভাঙবে। মা যখন ফোনটা রিসিভ করেছিল তখন মণি ওয়াশরুমে যাচ্ছিলো। গ্রামের বাড়ি হওয়ায় তখন ওয়াশরুম বেশ খানিকটা দূরে ছিল। মণি ওয়াশরুম থেকে এসে ঘরের ভেতর যেই ঢুকতে যাবে, ওমনি তার কাধে একটা হাত পরলো। সে ভেবেছিল, হয়তো তার ভাইয়েরা এসেছে।
পিছনে ফিরতেই এক ঝটকা এসিড তার মুখে শরীরে ছিটকে পরলো। মা তার ফোনটা কেটে রেখে দেয়ার সাথে সাথেই চিৎকার শুনতে পেল মণির। দৌড়ে বাইরে এসে দেখলো তার মেয়ে ছটফট করছে যন্ত্রণায়। ততক্ষণে আলাল পালিয়ে গেছে। মণির চিৎকারে আশেপাশেে মানুষজনও জড়ো হয়ে গেল। কিন্তু কেউ মণির মুখে গায়ে পানি দিল না। তারা কেউ আসলে জানতোই না এসিড পরলে কি করতে হয়। অনেকে তো এসিড কি জিনিস সেটাও চিনতো না। এসিড পরার সাথে সাথেই মনির একটা চোখ গলে যায়। তাৎক্ষণিক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে কিছু চিকিৎসার পর তাকে রেফার করা হয় ঢাকায়।
চিকিৎসা চলে এক বছরের মত। মণির দুটো চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। একসময় ডাক্তাররা মণির মা’কে বলেন যে, সামর্থ্য থাকলে যেন বিদেশ নিয়ে গিয়ে মেয়ের চিকিৎসা করান। কিন্তু, তা আর মণির ভাগ্যে ছিল না। মনি তখন ভেবেছিল তার জীবন সেখানেই শেষ। কিন্তু তার এক বান্ধবী তাকে জানায় যে, অন্ধরাও পড়াশোনা করতে পারে। তাকে সাহস জোগায় সেই বান্ধবী। মণি আবার ভর্তি হয় আগেরই স্কুলে। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগসুবিধার অভাবে তার পড়াশোনাটা হয়ে উঠে অনেক কষ্টকর। পড়াশোনায় তার ভাই তাকে অনেক সহায়তা করেছে। এভাবেই সে অনেক বাধাবিপত্তি কাটিয়ে আজকের জায়গায় এসেছে এবং স্বপ্ন দেখছে আরও এগিয়ে যাওয়ার। মণির পরিবার সেই আলালের নামে মামলা করলেও তারা টাকা আর ক্ষমতার গুনে জামিনে জেলের বাইরে চলে আসে। এখনো সেই অপরাধী জামিনেই আছে। স্বাভাবিক আর সুন্দর জীবনযাপন করে চলছে সেই নিকৃষ্ট অপরাধী।
চোখ হারানোর পর মণির দুর্বিষহ জীবনটাতে সে পরিবারের পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছে। তার মনের জোরই তাকে নিয়ে এসেছে এতদূর। নিষ্ঠুরতার যাঁতাকলে পিশে শেষ না হয়ে সে নিজেকে দাঁড় করিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়েছিল। সে পা রাখতে পেরেছে বিশ্ববিদ্যালয় গণ্ডিতে। সে পড়াশোনায় খুব একটা খারাপ ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি সে খেলাধুলা, নাচগানেও অনেক ভালো ছিল। সে সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দেখিয়েছে ভলিবল খেলায় আটবার চ্যাম্পিয়ন আর দুইবার রানার্সআপ হয়ে। “জয়ীতা” শিরোনামের একটা সরকারী প্রজেক্ট এ নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ২০১৪-তে সে আঞ্চলিক ও বিভাগীয় পর্যায়ে পুরস্কার লাভ করে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষেই বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বর্ষা নিক্ষেপে প্রথম হয়েছে। তার খেলাধুলার প্রতি মারাত্মক ঝোঁক ছোটবেলা থেকেই। আর তার প্রতিবন্ধকতা সেই ঝোঁক একটুও কমাতে পারে নি এখনো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার সময় সে ভেবেছিল এখানে হয়তো সে একাই অন্ধ। কিন্তু এসে দেখতে পেল-নাহ, সে তো একা নয়, অনেকেই আছে তার মত। ব্যস! তার উদ্যম আরও একধাপ এগিয়ে গেল। তার পড়াশোনা আরও বেশি সহজ করে দিল আমাদের Third EYE। Third EYE এর সাথে পরিচিত হওয়ার পর মণির কাছে মনে হলো, তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনটা নিয়ে আর চিন্তার কিছু নেই। পড়াশোনার, বিশেষ করে পরীক্ষায় সময়ের শ্রুতলেখক খোঁজার যে বিশাল একটা ঝামেলা, সেটা থেকে উত্তরণে সে প্রথম বর্ষেই Third EYE এর বিশাল সাপোর্ট পেয়েছে। সে তাই Third EYE এর প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।
এসিডের শিকারে চোখ দুটো হারালেও জীবনযুদ্ধে মণি হেরে যায় নি। চরম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের ছোঁয়া পেতে এখনো সে লড়ে যাচ্ছে। বাস্তবজীবনে আমরা কেউই সুপারহিরো দেখি নি, তবে শেষ করবো একটা কথা বলে- একজন সুপারহিরো থেকে মণি কিসেই বা কম?
✍️-মণির জীবনের গল্পটি শেয়ার করেছেন Third EYE এর Assistant Head of Recipient Affairs, Ridwan Afrin Mim এবং সম্পাদনা করেছেন Head of Volunteer Affairs, Sabira Ahmed Sara.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here