টেকনাফ থানার ১৯বছর আগের এসআই প্রদীপ ছিলেন আরো দূর্ধর্ষ

591

টেকনাফ থানার বহুল আলোচিত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এসআই থাকাকালিন সময় থেকে অপকর্মে জড়িত ছিলেন। এসআই থাকাকালিন সময় আদালতের নিদের্শ অমান্য করার অপরাধে ফেঁসে যেতে পারেন। একই সঙ্গে ফেঁসে যেতে পারেন তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার, টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, ১৯ বছর আগের দায়ের হওয়া মামলায় হাইকোর্ট ও নিম্ন আদালতের প্রদত্ত রায় ৭ বছর ধরে গোপন করা, আদেশ অবমাননা, বিনাবিচারে নিরীহ ব্যক্তিকে ৩ বছর কারাবাসের অভিযোগে সুনির্দিষ্ট তিন শাস্তিমূলক সুপারিশের দু’টির কোন ধরনের পদক্ষেপ না নেয়ায় ফেঁসে যেতে পারেন তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার, টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং তৎকালীন টেকনাফ থানার এসআই প্রদীপ কুমার দাস।

দীর্ঘ বছর পর এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার শুনানি আগামি ২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ওই মামলার আইনজীবী এডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দু।

মামলায় উল্লেখিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, টেকনাফ থানায় এসআই হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে ২০০১ সালের ২৮ মার্চ ১০০ বোতল ফেন্সিডিলসহ আলী হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেন ওই থানার তৎকালীন এসআই প্রদীপ। আলী হোসেনের বিরুদ্ধে প্রদীপ বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(বি) ধারায় একটি মামলা রুজুু করেন। যার মামলা নং-২৪/২০০১ইং। পরবর্তীতে ওই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নেন এই কর্মকর্তা। প্রায় ৩ মাস ২০ দিন পর ইলিয়াছকে গ্রেপ্তার করেন প্রদীপ। এরপর শুরু হয় নানা নাটকীয়তা।

আদালত সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনার ছয় মাস পর ওই মামলার চার্জশীট থেকে ফেন্সিডিলসহ গ্রেপ্তার আলী হোসেনের নাম বাদ দিয়ে উক্ত ফেন্সিডিলগুলো মো. ইলিয়াছের মর্মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর আদালত মো. ইলিয়াছের বিরুদ্ধে দেয়া চার্জশীট গ্রহণ করে ফেন্সিডিলসহ আটক আলী হোসেনকে অব্যাহতি প্রদান করেন। এ মামলায় ২০০৬ সালে তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রদীপসহ ৫ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই প্রদীপ কুমার দাশও আদালতে জবানবন্দি দেন। আদালত জবানবন্দি গ্রহণ করার পর আসামি পক্ষ থেকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জেরা করার জন্য নির্দেশ দেন। কিন্তু তখন আসামি পক্ষের কোন আইনজীবী উপস্থিত না থাকায় এক পর্যায়ে বিচারক আদালতে অন্য মামলায় উপস্থিত থাকা এডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দুকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাসকে জেরা করতে বলেন। মামলার কপি হাতে এডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দু দেখেন যে, ‘মামলার কপিতে মুল আসামি আলী হোসেনের নাম নেই’। এতে আদালতে জেরার মুখে পড়েন প্রদীপ। তখন আদালত বিষয়টি নজরে আনেন। আদালত বুঝতে পারেন, এই মামলায় জটিলতা আছে।

মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দু বলেন, বিচারক পুরো মামলার নথি দেখে আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে আইনজীবীকে জামিন আবেদন করতে বলেন এবং জামিন আবেদন করলে সাথে সাথে বিচারক মো. ইলিয়াছের জামিন মঞ্জুর করেন। এছাড়া এপিপিকে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য আবেদন করেন বিচারক। পাশাপাশি মামলার বাদী আদালতের বরখেলাপ করেছে মর্মে মন্তব্য করেন। মামলার সকল তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে এসআই প্রদীপের বিরুদ্ধে সুর্নিষ্ট তিন অপরাধ, ‘তিন বছরের জন্য কোন ধরনের ফৌজদারি মামলার তদন্ত করা হতে বিরত রাখা’, ‘বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ’ করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবরে আবেদন করেন আদালত।

এদিকে এসআই প্রদীপ স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-২, কক্সবাজার এর আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ২০০৬ সালে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন। যার নং-৪৬৭৭/২০০৬। হাইকোর্টের বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ও এটিএম ফজলে কবীরের দ্বৈত বেঞ্চে মামলা দায়েরের দীর্ঘ শুনানির পর ২০০৮ সালের ২৭ মার্চ ওই রিট পিটিশনের চুড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন।

এ মামলায় তৎকালীন প্রদীপের আইনজীবী এডভোকেট এএইচএম সামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, “১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৭(৭) ধারামতে মামলাটি অধিক তদন্তের জন্য আদেশ দিতেন কিন্তু প্রসিকিউশন পক্ষের ৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণের পর তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া আইন সঙ্গত নয়।”

ওই রায়ে প্রদীপের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতের দেয়া সুর্দিষ্ট তিন শাস্তির সুপারিশের একটি সংবিধান পরিপন্থী নয় মর্মে উল্লেখ করা হলেও বাকী দু’টি বহাল রাখে। কিন্তু হাইকোর্টের আদেশের কপি নিম্ন আদালতে এসটিপি যাতে সংযুক্ত না হয় সেই মিশনে নেমে পড়ে এসআই প্রদীপ। এই মিশনে সফলও হন তিনি।

এরপর কেটে গেছে দুই বছর। ২০১০ সালে উর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানতে পেরে নিম্ন আদালতের আইনজীবী এড. ফখরুল ইসলাম গুন্দুকে অবহিত করেন। এডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দু বিষয়টি জানতে পেরে প্রদীপের বিরদ্ধে দেয়া হাইকোর্টের রায়ের আদেশ কপি সংগ্রহ করে ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-২, কক্সবাজার আদালতে পুরনায় আবেদন করেন। আদালত বিষয়টি পর্যালোচনা করে ২০০৬ সালের নিম্ন আদালত এবং ২০০৮ সালের হাইকার্টের আদেশসহ দুটি আদেশ কার্যকর না করে ২০০৯ সালে কেন তৎকালীন এসআই প্রদীপকে পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে মর্মে জানতে চান। পাশাপাশি মূল আসামির বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল সম্পর্কে আদালতে অবহিত করার জন্য তৎকালীন চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ও টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ প্রদান করা হয়।

একই সাথে আদেশের সবকিছু পড়ে আদালত ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর একটি আদেশ প্রচার করেন। যার নং-৪৪। সেই প্রচারিত আদেশে এক মাসের মধ্যে ওই বছরের ২১ নভেম্বর আদেশের জবাবের দিন ধার্য করা হয়। কিন্তু সেই এক মাসের পরিবর্তে জবাব দীর্ঘ ৭ বছর পর ২০১৭ সালের ৬ অক্টোবর আদালতে জবাব দেন প্রদীপ।

এদিকে এসআই প্রদীপের দেয়া জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় আদালত ২০১৭ সাথে গতকাল পর্যন্ত শোকজের জবাব পর্যালোচনা করে শুনানির জন্য আগামী ২০২১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করেছেন।

মামলার তথ্যে জানা গেছে, রিট আবেদনকারী এবং উক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ হাইকোর্টের প্রদত্ত রিটের আদেশটি গোপন করে অভিযুক্ত তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন ধরনের বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে উল্টো পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়ার জন্য পুলিশ হেডকোয়ার্টারে সুপারিশ করেন। এবং পরবর্তীতে এসআই প্রদীপ কুমার দাসকে ২০০৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পরিদর্শক হিসেবে পদোন্নতি প্রদান করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

এডভোকেট ফখরুল ইসলাম গুন্দু বলেন, মানুষের সর্বশেষ আশ্রয়স্থল আদালত। কিন্তু আদালতের নির্দেশ মানা প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। আইন সবসবার জন্য সমান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here