বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের শ্লোগান “মাতৃভাষা বাংলা চাই” ছিলনা!

165

ডেস্ক রিপোর্টঃ

স্লোগানটা ছিলো “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “মাতৃভাষা বাংলা চাই” নয়।

যারা বাংলায় কথা বলতো তারা তারপরেও বাংলাতেই কথা বলত পারতেন। ঘটনাটা এমন ছিলোনা যে জিন্নাহর ঘোষণার পরদিন থেকে সবাইকে উর্দুতেই কথা বলতে হবে৷ তারপর থেকে বাংলায় কথা বলা অপরাধ বলে বিবেচিত হবে। ব্যাপারটা তেমন ছিলো না।

জিন্নাহর ঘোষণাটা ছিলো – “উর্দু,এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা”। শব্দটা খেয়াল করুন,”রাষ্ট্রভাষা”।

মি. জিন্নাহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ছাত্রদের সামনে যে ভাষণ দিলেন সেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, পাকিস্তানের প্রদেশগুলো নিজেদের সরকারি কাজে যে কোন ভাষা ব্যবহার করতে পারে – তবে রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে একটিই এবং তা হবে উর্দু।

তাহলে ঘটনা ক্লিয়ার যে ইস্যুটা ছিলো একমাত্র রাষ্ট্রভাষাকে নিয়ে। মাতৃভাষা নিয়ে নয়।

এই যে বাঙ্গালীর আন্দোলন- রফিক,শফিক,জব্বারদের আত্মদান,আরো নাম না জানা অনেকের বুকের রক্ত রাস্তায় ঢেলে দেওয়া এটা কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য।

২১ শে ফেব্রুয়ারি আসলেই আমাদের বাঙ্গালিয়ানা ভর করে শুধু। কিন্তু ইতিহাসের এতবছর পরে এসেও ভাববার বিষয় এই যে, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা আসলেই কতটা স্থান করে নিতে পারলো।

এখনো কি বাংলা আমাদের কাছে অবহেলার বিষয় হয়ে পড়ে থাকেনি?

রাষ্ট্রভাষা কেন বাংলা করার আন্দোলনে তৎকালীন সচেতন বাঙ্গালিরা এতটা ফুলেফেঁপে উঠেছিলো তার রাষ্ট্রীয়,সামাজিক,অর্থনৈতিক অনেক দিক রয়েছে। শুধু মাত্র বাংলায় কথা বলাটাই এখানে মুখ্য বিষয় ছিলোনা।

তমদ্দুন মজলিস সেই সময় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিল।

এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরে অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন, দৈনিক ইত্তেহাদের সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ, আর তমদ্দুন মজলিস প্রধান অধ্যাপক আবুল কাসেমের নিবন্ধ ছিল।

দৈনিক ইত্তেহাদের সম্পাদক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছিলেন, “উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা করিলে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষিত সমাজ রাতারাতি ‘অশিক্ষিত’ ও সরকারি চাকুরির ‘অযোগ্য’ বনিয়া যাইবেন” – ঠিক যা ঘটেছিল ব্রিটিশরা ফার্সীর জায়গায় ইংরেজিকে ভারতের রাষ্ট্রীয় ভাষা করার পর ভারতের মুসলিম শিক্ষিত সমাজের ক্ষেত্রে।

সেই কথার সূত্র ধরে বর্তমান দেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে কি পক্ষান্তরে তাই হয়নি?
উর্দুর সাথে লড়াইয়ে বাংলা বিজয় লাভ করতে পেরেছিলো ঠিক কিন্তু ইংরেজির সাথে লড়াই করে এখন পেরে উঠছেনা।

উর্দুকে হারিয়ে প্রকারন্তরে ইংরেজিই দখল করে নিয়েছে আমাদের। তুলনামূলক ইংরেজি কম জানা এখন অযোগ্যতা বলে বিবেচিত হচ্ছে। জ্ঞানের পরিমাণ যাই হোক, মুখে ইংরেজির খই ফুটলে আমরা তাকেই বিশাল যোগ্যতা বলে ধরে নিচ্ছি।

বাংলা জেনে যদি চাকরীতে পিছিয়ে পড়তে হয়,যদি ইংরেজি জানলেই তাকে এগিয়ে রাখা হয় তবে উর্দু রাষ্ট্রভাষা হবে বলে আবুল মনসুর যে আশংকা করেছিলেন তা কি বর্তমানে এসে সত্যি হচ্ছেনা?
উর্দুর জায়গায় ইংরেজিটাই তার জায়গা দখল করে নিলো,পার্থক্য শুধু এতটুকুই।

বাংলার প্রতি অগাধ ভালোবাসায় হৃদয় আমাদের বয়ে যায় বলে বলে রাতদিন ইংরেজির পিছনে ছুটা এক হিপোক্রেট জাতি আমরা।

বাংলার প্রতি এতই মমত্ববোধ থাকলে একটা জরিপ চালিয়ে দেখুন তো,বড় বড় শিক্ষিত নাম যশওয়ালা কয়টা ব্যক্তির সন্তান শহরের সরকারি প্রাইমারি স্কুল গুলোতে পড়ে।লাখ টাকার বেতনে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলেই তাদের ছুটাছুটি। তারা ধরেই নেয় এসব বাংলা মিডিয়ামের বিনা পয়সার স্কুল তো বস্তিবাসীর জন্য।

ধরে নিলাম সরকারি প্রাইমারি স্কুল গুলোর মান নিম্ন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করে দিনের পর দিন এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিম্নমানে ফেলে রাখার পিছনে দায় কাদের?

“রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” বলে আগুনঝরা স্লোগানে এগিয়ে গিয়ে জীবনের বিনিময়ে যে ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো,সেই রাষ্ট্রে সেই “বাংলা” ভাষার এমন অবহেলা, এমন তাচ্ছিল্য শহীদদের প্রতি অপমান বৈ আর কিছু নয়। মুখে ভাষা প্রেম বলে দিনরাত ইংরেজির পিছনে ছুটা এই আমাদের এত ভাষা প্রেম হাস্যকরই বটে।

মন থেকে দোয়া করি সেদিন ভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া সেসব বোকা মানুষগুলো ভালো থাকুক।

লেখক- এ.এম কাউসার, তরুণ লেখক ও গবেষক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here