বিষাদের ‘ড’

17

বাইরে শহরের পচাগলা ধুয়ানো ঝুপঝুপ বৃষ্টি, ভেতরে বদ্ধ বাতায়নে মানুষের জটলা পেড়ে বের হওয়া নাক সিটকানো গন্ধে তূর্ণা-নিশীতার ‘ড’ বগির ২৪ নং সিটে চড়ে ঢাকার অভিমুখে চলছি, পাশের সিটে মিনিট দশকের পরিচয়ে আবিষ্কৃত রসিক সন্দিপন দা’র সাথে মন খোয়ানো আলাপচারীতায়। গ্রামগঞ্জ, মাটঘাট, ঝুপঝাঁড় ও পাহাড় নদী ভেদ করে ট্রেন যখন ঝনঝনিয়ে আপন গতিতে ছুটতে লাগলো, আমাদের দুজনের কথাবার্তায়ও পাল্লা দিয়ে বেগ পেয়ে প্রবেশ করলো গভীর থেকে গভীরতরে। কিম জন উনের ডেশিঙ নেতৃত্ব, ট্রাম্পের ক্ষ্যাপাটে স্বভাব, বিশ্ব পু্ঁজিবাদের লাগামহীন ঘোড়দৌড়, ইয়াবা দমনে বাংলাদেশ সরকারের তেলেসমাতি উদ্যেগ, ফুটবল বিশ্বে নেইমার-মেসির দৌরাত্ম্য ও বলিউড তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন থেকে শুরু করে বাদ রইলো না কোনো কিছুই। অবশ্য সন্দিপন দা একজন আদর্শ এক্স চবিয়ান, সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি কর্পোরেট হাউজের বড় কর্মকর্তা, দিদির সাথে আই মিন গার্লফ্রেন্ডের সাথে পাক্ষিক সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মূলত তাঁর ঢাকা যাত্রা। তাঁর ভাষ্যমতে পনের দিন অন্তর অন্তর প্রেমিকার সাথে ডেট-টেট করে ভালোবাসায় শাঁন না দিলে বিএসআরএমের ন্যায় ইস্পাতদৃঢ় জমাটবদ্ধ বন্ধনেও নিমিষে ফাটল ধরে যায়, কথাটা কোনো অর্থে তিনি মন্দ বলেন নি! ফাইনালি দুজনার চতুরঙ্গে রঙ চড়ানো আলোচনা থামাতে হলো কমলাপুর রেল স্টেশনের ঢেউখেলানো অনিন্দ্যসুন্দর প্ল্যাটফর্মে নেমে। তখন ঘড়িতে বাজে সকাল সাড়ে ছয়টা, আমি যখন বিদায় জানাতে উদ্যত হয়ে পড়লাম, দাদা পণ করে আগে থেকেই বসে আছেন আমাকে নাস্তা না করিয়ে কিছুতে ছাড়বেন না! যে কথার সে কাজ আমিও মোগলের হাতে পড়ার মতো দাদার সাথে নাস্তা সেরে গন্তব্যপথ আগারগাঁওর উদ্দেশে রওনা হলাম। অল্পখানেক পরিচয়ে অপরিচিত একজন মানুষের সাথে এমনতরো নির্ভেজাল আন্তরিকতা মেশানো আচরণ আমার জানার ভান্ডারে আর দ্বিতীয়টি নেই। সন্দিপন দা আমার কাছে একটি বিষ্নয়াপূর্ণ নাম। নির্মম হলেও সত্যি গতরাতে ফেবুর অছিলায় জানতে পারলাম মাসখানেক আগে ‘ড’ বগির সেই বিশুদ্ধ সন্দিপন দা তেরদিন পূর্বে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে। আমি কিছুতেই ভাবতে পারছিনা একজন চরম রগুড়ে মানুষের কীভাবে হার্টস্ট্রোক হয়ে মৃত্যু ঘটতে পারে, সত্যি চিন্তাতীত! সাত ঘণ্টার ক্ষণিকের পরিচয়ে সেই সরলতামাখা চেহারাটি অন্তরের কতোটা জায়গা জুড়ে আসীন হয়ে আছেন এ মুহূর্তে ভাষায় প্রকাশ করা আমার কাছে বেশ দুঃসাধ্য। এবছরই চারহাত এক করে সাত পাকে বাঁধার কমিটমেন্ট দেয়া দিদির কথা মনে আসতে মনটা আরো বিষিয়ে উঠলো। না জানি বেচারির মনে কীরকম নীল যন্ত্রণার প্লাবন বইছে, পারবে তো এ শোকের ভার বইতে!

বিধাতা দিদিকে এই করাল শোক সইবার শক্তি দিক এবং দাদার পরকালীন জীবনের সদ্গতি হোক এ প্রত্যাশাটুকুন করছি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here