শিক্ষাব্যবস্থার অচলায়তনঃ ইশ্বর থাকেন ঐ ভদ্রপল্লীতে!

188

করোনা বিষয়ক জাতীয় পরামর্শ কমিটির সবাই সরকারের খাসকামরার লোক ও এলিট সম্প্রদায়গোছের। তিনারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার ব্যাপারে সবসময় গভর্নমেন্টকে পরামর্শ দিয়েছে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের শিক্ষকদের মনমর্জির উপর। তিনারা যখন সার্ভে করেন কিংবা পরামর্শ চান সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেই চান। মাস না পেরোতে মাইনে একাউন্টে ঢুকে যাওয়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের কেউ তো দিল থেকে চাইবেন না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহসা খুলে যাক। টাইমে টাইমে বেতন পেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জনম বছর বন্ধ থাকলেও তিনাদের আপত্তি থাকবার কথা না।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের বাইরেও লক্ষাধিক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ঊর্ধ্বমান গতি সচল রাখতে সম্পূর্ণ ছাত্রছাত্রীদের টিউশন ফি এর বদৌলতে ইল পেইডে রাতদিন গতর খেটে চলেছেন, তার কোনো খবরাখবর সরকারের টপলেভেল রাখে কিনা আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ছুটি ১ মাস, ১৫ দিন, ২ মাস করে বাড়াতে বাড়াতে সেটি নিরবিচ্ছিন্নভাবে ১ বছরের বেশিতে গিয়ে ঠেকবে, তা সবার কল্পনাতীত ছিলো।
এরচেয়ে আমার অত্যাশ্চর্য লাগছে এ ভেবে করোনা সংক্রমণ কিছুটা কমে আসলেও গভর্নমেন্ট একটিবারের জন্যও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে ট্রায়াল দিয়ে দেখেনি কী ঘটনঅঘটন ঘটে যায় স্টুডেন্টস ও শিক্ষকদের উপর। পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে ট্রায়াল দিয়েছে। বাড়ার সাথেসাথে আবারও অফ করে দিয়েছে। এমনকি সংক্রমণ কিছুটা কমে আসলে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারত(প্রায় রাজ্য) পাকিস্তানও তা করেছে। অথচ আমাদের সংক্রমণের হার সেসময়ে ভারত পাকিস্তানের চেয়ে ঢের কম ছিলো। জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আমাদের গভর্নমেন্টের সদিচ্ছা থাকলে তিনমাস অনায়াসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালানো যেতো। প্রয়োজনবোধে অতিরিক্ত ঝুঁকি মনে করলে শিফটিং করে ক্লাস ভাগ করে করে চালাতে পারতো। বিশ্ববিদ্যালয় কিছু কিছু পরীক্ষা শুরু করলেও কোনো হেতু ব্যাতিত আচমকা বন্ধ করে দেয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ফোর্থ ইয়ারের সকল রিটন পরীক্ষা শেষ, কেবল বাকি ভাইভা, সেই ভাইভা নেয়ারও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সৎসাহস দেখাননি। একেবারে শুরু থেকে আজাবধি গভর্নমেন্ট শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অজানা এক গোঁয়ার্তুমি দেখিয়ে গিয়েছে। এ একগুঁয়ে আচরণ ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক ও শিক্ষকের মনে যেমন বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে একইভাবে সরকারি বেতনভাতার বাইরে থাকা লক্ষলক্ষ সম্মানিত শিক্ষকদের মনে মিছরিরছুরির মতো বিদ্ধ করেছে। কিছু কইতে কিংবা সইতে না পেরে কষ্টে রাগে ক্ষোভে ভেতরে ভেতরে অবিরত রক্তক্ষরণ হয়েছে। দুএকদিন আগে পত্রিকার মারফতে দেখলাম দুজন অনার্স মাস্টার্সের ননএমপিও শিক্ষক জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন(এধরণের ইন্সিডেন্ট ঘটবার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া রীতিমতো রাষ্ট্রীয় লজ্জা। আল্লাহ আমাদের দুর্ভাগা সহকর্মীদের উচ্চ মকাম দান করুন। আমিন।)।
সহস্র ভাড়ায় চলা কিন্ডারগার্টেন তল্পিতল্পা গুটিয়ে বন্ধ করে দিতে হয়েছে। দলেদলে অভিশপ্ত শহর ছেড়েছেন হাজার হাজার শিক্ষক। এছাড়া অসচ্ছল পরিবার থেকে আাসা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অনার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থীর টিউশনির টাকায় নিজের প্রয়োজনীয় খরচ মিটিয়েও চলে পরিবারের অন্যান্যদের ভরণপোষণ ও জীবনপাত। এগুলো সম্পর্কে সরকার ওয়াকিবহাল কিনা, তা আমার মতোন অনেকের কাছে বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন!
আমি সরকারের বহুবিধ সফলতা অস্বীকার করবার পক্ষপাতি নই। করোনার ফার্স্ট ওয়েভ সামাল দিতে পৃথিবীর বাঘা-বাঘা রাষ্ট্র যেখানে হিমশিম খেয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ইটস অ্যা গ্রেট এচিভমেন্ট। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশে এখন সেকেন্ড ওয়েভ খুব জোরেশোরে চলছে। এমুহূর্তে সবকিছু কঠোর লকডাউনের আওতায় আনা অতি জরুরি। সরকারও তা করবার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষজন লকডাউন তোয়াক্কা না করে যাপিতজীবনে কোনোধরণের চেঞ্জ না আনাটা অতিশয় দুঃখজনক।
সবকিছুর ছাড়িয়ে কঠিন সত্য হলো করোনা ঝড় যুগযুগ ধরে আমাদের উপর বইতে থাকবে না। কিছু সময় বাদে জাগতিক নিয়মে শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু করোনা উত্তর আমাদের দেশের শিক্ষকসম্প্রদায়ের অব্যক্ত ক্ষতের লিগ্যাসি বহুকাল বয়ে বেড়াতে হবে। একটি শুদ্ধ সমাজব্যবস্থার পাহারাদার ও সত্যাসত্য যাচাইয়ে সর্বাগ্রে থাকা শিক্ষকগণ নিয়ে এরকম বিমাতৃসুলভ আচরণ রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রতিটি সিঁড়িতে কুঠারাঘাত। সরকারি বেতনের বাইরেও লক্ষলক্ষ শিক্ষক এদেশের ছেলেমেয়েদের বিদ্যাদানে নিয়োজিত আছেন, বছর পেরিয়ে গেলেও মোটাদাগে বলা যায় রাষ্ট্র তাঁদের খোঁজখবর সেই অর্থে নেয়নি। রাষ্ট্রের তরফ থেকে যৎসামান্য প্রণোদনা দেয়ার কথা বললেও, তা কেউ পেয়েছেন কেউ পাননি। এমনই। শিক্ষকসম্প্রদায়ের  কিছু অংশ আরাম-আয়েশে আমুদ-পূর্তিতে দিনযাপন করবেন, অন দ্য আদার হ্যান্ড কিছু শিক্ষক অর্ধাহারে অনাহারে থেকে কায়ক্লেশে দিনাতিপাত করবেন, এটি কোনোভাবে একটি সভ্য রাষ্ট্রের মানদণ্ড হতে পারে না। অন্তত শিক্ষকসম্প্রদায়কে এ দুর্যোগ দুর্বিপাকে ইক্যুয়েলি ট্রিট করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
অন্তত ১ বছর প্রায় ১ মাস সময়ের অবজারভেশন থেকে মানিকের মতো করে বলতে পারি ইশ্বর থাকেন ঐ ভদ্রপল্লীতে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here