একজন শিক্ষক মুক্তিযোদ্ধার ইতিকথা

75

ডেস্ক রিপোর্টঃ

সর্বমহলে স্বীকৃত নির্লোভ, নিরহংকার, নির্মোহ, সদা হাস্যোজ্জ্বল, আগাগোড়া ভদ্র-নম্র, বিনয়ী, সাদা মনের একজন মানুষ মাষ্টার জাহেদ হোসন স্যার। যার জীবনের ৩২টি বছর কেঁটেছে মানুষ গড়ার কাজে।

১৯৪৭ সালের ২৭ অক্টোবর তদানীন্তন টেকনাফ থানার ৪নং সাবরাং ইউনিয়নের অজপাড়া গাঁও শাহপরীর দ্বীপের উত্তর পাড়ার কৃষক পরিবারে মরহুম নজির আহমদ আর মরহুমা বিওলা খাতুনের সংসারে জন্ম নেন এই ক্ষণজন্মা শিক্ষাগুরু ও বীর মুক্তিযোদ্ধা।গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক পাঠ সম্পন্ন করে টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হতে ১৯৬৪ সনে তদানীন্তন মেট্রোকোলেশন (এসএসসি) পাশ করে একই বছর সরকারী প্রাথমিক স্কুলের সহকারী শিক্ষক হিসাবে টেকনাফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদানের মাধ্যমে শিক্ষকতার মত মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। শিক্ষকতার সাথে সাথে নিজের লেখাপড়াও চালিয়ে যান। ফলশ্রুতিতে ১৯৬৭সালে কক্সবাজার সরকারী কলেজ থেকে ইন্টারমেডিয়েট (আইএ) পাশ করে স্নাতকে ভর্তি হন। জীবন জীবিকার সন্ধানী এই মানুষটি ১৯৭০সালের অসহযোগ আন্দোলনের পথ ধরে ১৯৭১সলের ২৬ মার্চ দেশ স্বাধীনের প্রবল বাসনা নিয়ে নিজের প্রাণবাজি রেখে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন সবারই অগোছরে। ১নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর(অবঃ) রফিকুল ইসলাম বীর বিক্রমের নেতৃত্বাধীন ক্যাপ্টেন আব্দুস সোবহানের সার্বিক তত্বাবধানে অধিনায়ক শ্রী জয়লেন বড়ুয়ার স্বশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে মোরং পাড়া, সোনাই ছড়িস্হ ৩০৩নং ব্যাটালিয়নে পাক হায়নাদার ও দেশীয় রাজাকার আল্ বদর, আল্ শামসদের বিরুদ্ধে পরম সাহসিকতার সাথে দীর্ঘ ৯মাস স্বশস্ত্র যুদ্ধ করেন। যৌবনের সোনালী দিন আর মা-বাবার একমাত্র আদরের সন্তানের আদর সোহাগের মায়া-মমতা ত্যাগ করে মৃত্যুর ঝুঁকি নেয়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ শেষে বীর বেশে ফিরে আসলেও কোন দিন নিজের গর্বিত কর্মের আচরণ কারো সাথে করেননি বরং শিক্ষকতার মহান পেশায় ফিরে সাধারণ জীবন যাপন করে মানুষ গড়ার মহাকারিগরে মনোনিবেশ করেন। শিক্ষকতা জীবনে তাঁর হাতে গড়া ছাত্ররা আজ দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মাননীয় বিচাপতি, সচিব, যুগ্নসচিব, স্বনামধন্য চিকিৎসক, প্রকৌশলী, উকিল, স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সহ নানাবিধ কর্মের মাধ্যমে দেশসেবার মহান ব্রতি নিয়ে নিজ নিজ কর্মস্হলে অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। যা দেখে প্রায় ৭৪বছর বয়স্ক এই বীর মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষক পরম তৃপ্তি অনুভব করেন। শিক্ষকতা জীবনে শিক্ষাদান ব্যতিত রাজনীতি কিংবা অন্য কোন পেশায় নিজেকে সম্পৃক্ত না করে এক অতুলনীয় নজির স্হাপন করেছেন।একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কোন দিন কোন পদ-পদবীর লালসায় তাঁকে আকৃষ্ট করেনি। ১৯৭৭ সাল হতে ১৯৯৬ পর্যন্ত টেকনাফ ও নিজ এলাকায় প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে অবসর নেয়ার পর হতে অদ্যাবধি সমাজ উন্নয়নমূলক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। নিজ গ্রামে শাহ্পরীর দ্বীপ হাজী বশির আহমদ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্টার অন্যতম উদ্ধ্যোক্তা তিনি। ২০১৪সালে এক অনাকাঙ্ক্ষিত দূর্ঘটনায় এক পাঁ ভেঙ্গে ১বছর চিকিৎসা নিয়ে কোন মতে হাঁটাচলা করতে পারেন কিন্তু বীরের বীরত্ব থেমে নেই। দেশ এবং জনগণের স্বার্থে যেখানে প্রয়োজন সেখানেই তিনি স্বশরীরে হাজির হন। কি বেড়িবাঁধ, কি রাস্তা, কি শিক্ষা সব প্রয়োজনেই তিনি সদা অগ্রভাগে থেকে বিরামহীন নিঃস্বার্থ শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। ৭৪ বছরের একজন পৌঢ় মানুষ শুধুই দেশ মাতৃকতায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে পরম সাহসিকতা আর সততার সাথে নিজেকে জনকল্যাণে বিলিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি টেকনাফ উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি এবং উপজেলা দূর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির ৪বারের সভাপতি। অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা উপজেলা ভিত্তিক মুক্তিযোদ্ধা যাছাই-বাছাই তালিকায় ১১ নাম্বারে নিজের নাম দেখে আনন্দাশ্রু ঝরিয়ে বলেন স্বাধীনতার ৪৯বছর পর মৃত্যুর আগ মূহুর্তে হলেও নিজের নাম সরকারিভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি দেখে আমি অত্যধিক খুশি ও পরম তৃপ্ত। তিনি বলেন- স্বশস্ত্র যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, সারা জীবন শিক্ষকতা ও শিক্ষিত সমাজ গঠনের কাজ করছি এর চেয়ে বড় আর কি তৃপ্তি হতে পারে। তিনি আশা নিয়ে বলেন বাকী জীবনও মানুষের সার্বিক কল্যাণে কাঁটিয়ে দিবার জন্য সবার কাছে আন্তরিক দোয়া চাই।

আমরা এমন একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষকের ছাত্র এবং এলাকার মানুষ হিসাবে নিজেদের গর্বিত ও ধন্য মনে করি। দোয়া করি মহান আল্লাহ্ পাক আমাদের সবার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বীর মুক্তিযোদ্ধা জনাব মাষ্টার জাহেদ হোসেন স্যারের হায়াতে বরকত দান করুন এবং সুস্হতার সাথে বাকী জীবন কাঁটানোর তওফিক দান করুন।

লেখক:

শরীফ গফফারী, শাহপরীরদ্বীপ।

২৭/১১/২০২০ ইং

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here