বীর মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাঃ ইতিহাসের দায়!

122

টেকনাফের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের রণাঙ্গনের অকুতোভয় সৈনিক তথা মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি আর্টিকেল লিখবার আকুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে রেখেছি বহু আগে থেকে। বলা চলে এ বিষয়ে আমার প্রবল অভিপ্রায় ছিলো। যার দরুন বছরতিনেক আগে টেকনাফ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তৈরি করা মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকাও সংগ্রহ করেছিলাম। আমার সংগৃহিত সেই তালিকায় জীবিত, মৃত ও মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন শহিদ হয়েছেন ৪ জনসহ সর্বসাকুল্যে ২৩ জনের নাম লিপিবদ্ধ ছিলো। তালিকায় কারা আছেন, কারা নেই কিংবা তালিকা প্রণয়ন নিয়ে আমার অতো হাঁসফাঁশ ছিলো না। বস্তুত আমার সলিড ইন্টারেস্ট ছিলো তালিকায় স্থান পাওয়া জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে ফিজিক্যালি সাক্ষাৎ করে তাঁদের চোখে স্বাধীনতা যুদ্ধের বীরত্বকাহিনি শুনে নিজের মনকে পরিতৃপ্ত করা। এটি আমার অগ্রাধিকার বাসনা। এরপর না হয় তাঁদের বীরত্বগাঁথা দু-চার কলম লিখে সবার লক্ষ্যে তুলে ধরা। বইপুস্তকে পড়া আর একজন সম্মুখ সারির যোদ্ধার মুখে যুদ্ধকাহিনী শোনার মধ্যে আসমান জমিন ফারাক, তা বলবার অপেক্ষা রাখে না! নিসন্দেহে বলা যায় স্বাধীনতা পূর্ব কিংবা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশের সাহিত্যের প্রধানতমো উপজীব্য ছিলো মুক্তিযুদ্ধ। যা আজাবধি বহমান। এখনও সাহিত্যের বিভিন্ন ধারায় মুক্তিযুদ্ধ নতুনমাত্রায় নতুনভাবে আবিষ্কৃত হয়। মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদগণ ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা বাঙালি জাতির সর্বাধিক শ্রদ্ধেয়। এবং মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠতমো শ্রদ্ধাবোধের জায়গা। এ বিষয়ে দেশের সর্বস্তরের মানুষ এক ও অভিন্ন। কোনো তর্ক নেই। নেই বাদ বিসম্বাদ।
স্বল্পঅল্প তর্কবিতর্ক হয় তখনই, যখন রাজনৈতিকভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় অমুক্তিযোদ্ধারাও স্থান পান। মানুষ খুব বেশি আশা করেন, অন্তত এ পবিত্র জায়গাটি রাজনীতির ঊর্ধ্বে থাকুক। কিন্তু থাকেনি। পলিটিক্সটা এ জায়গায় ঢেরবেশি হয়েছে। ১৯৭২ সালে ১ লক্ষ ৩১ হাজার সামথিং মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও ৫০ বছর পরে এসেও তার সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে এদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যাও কিলবিলিয়ে বেড়েছে। মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের তখন থেকে তাড়না ছিলো একটি সহিশুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা জাতির কাছে সেটেল্ড হয়ে যাক। তাঁদের চেষ্টাও কম ছিলো না। তারপরও হয়নি কখনও, কিংবা এখনও। ১৯৮০ সালে জন্ম নেয়া বাংলার দামাল ছেলেও যখন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, এটি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বুকে ছুরি চালানোর শামিল এবং এরকম মুখরোচক বিষয়টি আমাদেরকেও শূলবিদ্ধ করে।
এবার একটু টেকনাফের দিকে ফিরি। সম্প্রতি টেকনাফের ২১ জন মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকাটি প্রকাশিত হয়েছে, তা আমার কাছে আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা বিস্ময়কর ঠেকেছে। ঠিকবেঠিকের বিষয়টি অবশ্য গবেষণা সাপেক্ষ। আমি ঐদিকে হাঁটতে চাই না। আমার কনসার্ন হলো এখানে, নতুন যে মৃত জীবিত মিলিয়ে ২১ জনের নাম এসেছে, তা আমার হাতে সংগৃহিত তালিকার সিংহভাগের সাথে বিসদৃশতা রয়েছে। খটকা লাগবার জায়গাটি মূলত এখানে। এবং অত্যাশ্চর্যের বিষয় হলো, নতুন করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া অনেককে কখনো বলতেও শুনিনি আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি কিংবা নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে ক্লেইম করেছেন অবরেসবরে। এখন কোয়েশ্চন হলো, তারা এ্যনলিস্টেড হলেন কীভাবে। মুক্তিযোদ্ধা কারা, কী কী যোগ্যতা বলে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পরিগণিত হবেন, তার তো একটি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা বা সলিউশন আছে সেই ১৯৭২ সাল থেকে (মুক্তিযোদ্ধা মানে এমন একজন ব্যাক্তি যিনি মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত যেকোনো সংগঠিত দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন, ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়েছেন, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানের অধীনে চাকুরি করবার পরও তাদের এভয়েড করেছেন, চার ফোর্স, কাদেরিয়া, হেমায়েত ও মুজিব বাহিনীর সদস্যগণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত )। এটি কতোটুকু ফলো করা হয়েছে, তা আমার কাছে কুয়েশ্চনেবল! তালিকা প্রণয়ন তথা যাচাই-বাছাই করবার ক্ষেত্রে যদি কেউ পলিটিক্যালি বা ভিন্নুপায়ে ফেভার পান, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এ দায় সংশ্লিষ্ট লোকগুলো কোনোভাবে এড়াতে পারেন না। এমনিতে নানা মহলে প্রশ্ন আছে, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা ৭২ পরবর্তী বহুবার কাটছাঁট হয়েছে। যে দল ক্ষমতায় এসেছে, সেই দলই রাজনীতির মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে এ স্পর্শকাতর জায়গাটিকে বেছে নিয়েছে। এটি আমাদের জাতীয় দীনতা। আমার দৃষ্টিতে চুপিসারে নয়, প্রতিটি উপজেলায় গণশুনানি করে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রণয়ন করা উচিৎ। অন্তত জনমনে এখন যে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের উদ্রেক সৃষ্টি হচ্ছে, তা বহুলাংশে প্রশমিত হতো। মোটমাট অনেকটা বিশ্বাসযোগ্য ও প্রণিধানযোগ্য হতো। প্রশ্ন তুলবার অতোটা আর সুযোগ থাকতো না। অন্যথায় ইতিহাসের কাছে দায়মুক্তি আমাদের কখনও ঘটবে না।
ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে তো?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here