আমিনুল বাঁধন:

“তোমাদের মন যেথা চায় চলে যাও

কিন্তু আমি রয়ে যাব এই বঙ্গোপসাগরের তীরে।
দেখিবো দখিনা সমীরণে সাগরলতার দোলা,
দেখিবো সাগর তীরে গোধূলির রক্তিম সূর্যের খেলা”!

টেকনাফ
চিত্র : টেকনাফ

বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণের সীমান্ত উপজেলা টেকনাফ চির সবুজের একটি শহর। কক্সবাজার জেলাসদর থেকে এর দূরত্ব ৮৬ কিলোমিটার। টেকনাফ উপজেলার পূর্ব প্রান্ত দিয়ে বয়ে গেছে নাফ নদ; এই নাফ নদের থেকেই এই অঞ্চলটির নামকরণ হয়েছে।
নৈসর্গিক সৌন্দর্যমন্ডিত ক্ষুদ্র আয়তনের এ শহরটি সত্যিই খুবই সুন্দর, মনোলোভা এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ। সবুজ নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে চোখ জুড়িয়ে যাবে যে কারও।​ ইট-পাথরের শহরের খুপড়ি ঘরে সবই কৃত্রিম। বিপরীতে ছায়ায় ঘেরা, মায়ায় ভরা এই স্থান, আঁকা-বাঁকা বয়ে চলা নদী-খাল, সবুজ শ্যামল মাঠ সবকিছুই প্রাকৃতিক। এখানকার মেঠো পথে রাজহাঁসের ছুটে চলা। হাঁসের প্যাঁক প্যাঁক শব্দে মন ভরে যাবে পথচারীদের। মেঠো পথের দু’ধারে সুপারি গাছের ডালের ঘেরার ফাঁকে ফাঁকে বাতাসে দোল খায় জবাফুল। এখানকার মানুষের ঘুম ভাঙে পাখ-পাখালির কিচিরমিচির শব্দে। বর্ষাকালে দামাল ছেলেরা খাল-বিলে ভীষণ বেপরোয়া হয়ে খেলা করে। প্রবীণ পুরুষরা গল্পের ছলে মাছ শিকারের জাল বুনেন আর নারীরা কাঁথা সেলাই ও সাংসারিক বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। মাঠজুড়ে সবুজ ফসলের সমারোহ। দখিনা বাতাস দোলা দেয় সে ফসলকে। সবকিছুই দেখলে মনে হবে এ যেন শিল্পীর রংতুলি দিয়ে আঁকা কোনো ছবি। আর এই প্রতিচ্ছবির নামই সবুজ কন্যা টেকনাফ।
নয়নাভিরাম এসব দৃশ্যাবলি প্রকৃতিপ্রেমী মানুষদের করে অভিভূত। মন পবনের নৌকায় ভেসে মানুষ হারিয়ে যায় কল্পনার রাজ্যে।এখানের প্রকৃতি অপরূপ সাজে সুসজ্জিত। এখানে দর্শনীয় স্থানের অভাব নেই! কিন্তু তার মধ্যে টেকনাফ সমুদ্র সৈকত রূপে-গুণে-বৈচিত্রে অনন্য।
দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের পাশ দিয়ে তৈরি বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ সড়ক টেকনাফ সমুদ্র সৈকতকে আরও নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগর ও পাহাড়ের বুক চিরে চলে গেছে দীর্ঘ ৮০ কিলোমিটারের এ সড়ক। এ সড়ক দিয়ে ভ্রমণ আপনার মনে মাদকতা সৃষ্টি করবেই। একদিকে পাহাড়, অন্যপাশে সারি সারি ঝাউবন আর উত্তাল সমুদ্রের গর্জন! এত সৌন্দর্য ভেদ করে তবেই পৌঁছুতে হয় টেকনাফ সমুদ্র সৈকতে। আর সৈকত! সে তো আরেক পৃথিবী, সমুদ্রস্বর্গ! সত্যি কক্সবাজার মূল সৈকত থেকে একেবারেই আলাদা টেকনাফ সৈকত। নিরেট বালু, একপাশে ঝাউবন, কিছুদূর এগোলেই পাহাড় মিশেছে সাগরে। সেখানে সৈকত নেই। সেটা আরেক সৌন্দর্য।
বাংলাদেশের মৎস্য আহরণের বড় একটি ক্ষেত্র টেকনাফ। মায়ানমার থেকে যেসব মাছ আসে আমাদের দেশে তার প্রধান ক্ষেত্রও টেকনাফ। কিনারজুড়ে চোখে পড়বে সুদৃশ্য বাহারি সব নৌকা। নৌকাগুলোর মধ্যেও রয়েছে শৈল্পিক ছোঁয়া। সৈকতের বাড়তি সৌন্দর্য এটি। এখানকার সৈকতের চরিত্র কক্সবাজার থেকে আলাদা। ঢেউগুলো বেশ বড়। যখন ভেসে আসে কিনারে সেটা ছড়িয়ে পড়ে অনেকদূর জুড়ে। ফেনা তোলে দুধের মতো। অস্ফুটে কেউ বলেও ফেলতে পারেন, দুধসাগর নাকি!
এই সৈকতের আরেকটি বিশেষত্ব হলো পাহাড়-সাগর-পাহাড়ি বন একই রেখায় দেখতে পাওয়া। ঢেউগুলোও ‍আসে বেশ ভেঙে ভেঙে। যখন ‍আছড়ে পড়ে কিনারে তখন ভাগ হয়ে ‍যায় স্তরে স্তরে। কক্সবাজার সৈকতের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে যে দুর্নাম আছে সেটা নেই টেকনাফে। সন্ধ্যায় রূপটা বদলে যায়। বদলে যায় সব সাগরের রূপই। তবে টেকনাফ সৈকত তবু যেন অন্যরকম। জাগতিক নিস্তব্ধতা নিত্যনৈমিত্তিক। সাগরের গর্জন স্বর্গীয় সুধা। শামুক ঝিনুক কুড়িয়েদের জন্য বিচটি খুবই উপযোগী। মানুষের হ্যাপা কম। নির্বিঘ্নে কুড়াতে পারেন কুড়িয়েরা। অনেকটা সাগরের ঢেউয়ে মাছ ধরার ভঙ্গিতে, কাপড়ের গোলাকার জালমতো তৈরি করে সংগ্রহ করা হয় সাগরের অলংকার শামুক, ঝিনুক।

টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ
চিত্র : টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ

অন্যদিকে সাগর তীরে বসে ভ্রমণ পিপাসু কিংবা রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষরা ভরা পূর্ণিমায় রূপালি চাঁদের দ্বিগল হাসি উপভোগ করার মত সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। সাথে মাছ ধরার নৌকার হট্টগোল কিংবা মানুষের কোলাহল ব্যতিরেকে সুনসান নিরবতায় উত্তাল সাগরের মায়াবী গর্জন! এ যেন পৃথিবীর বুকে এক খন্ড স্বর্গরাজ্য।

আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয়, বর্তমান সরকার টেকনাফ সমুদ্র সৈকতকে ঘিরে মেগা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে। সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়ে গিয়েছে। আগামী কয়েক বছরে অবকাঠামোগতভাবে পাল্টে যাবে এ টেকনাফ সমুদ্র সৈকতের চিত্র। শিগগিরই এ অঞ্চল পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করতে সক্ষম হবে।

যেভাবে যাবেন:
ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফ যাওয়া যায় সড়কপথে। এ পথে চলাচলকারী এসি বাস হল সেন্টমার্টিন সার্ভিস। এছাড়া শ্যামলী পরিবহন, সৌদিয়া পরিবহন, এস আলম পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজের নন-এসি বাস চলে এ পথে।
সবচেয়ে আরামদায়ক ও রোমাঞ্চকর কক্সবাজারের কলাতলী মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে সিএনজি, মিনি-কার এবং নীল দরিয়া সার্ভিস দিয়ে যাতায়াত। তাছাড়া, টেকনাফ শহর থেকে টমটমে ২০ মিনিটের দূরত্ব সৈকত। রাস্তাঘাটের ‍অবকাঠামো মোটামুটি। কলাতলী মোড় থেকে জনপ্রতি ভাড়া ২০০-৩০০ টাকার মধ্যে এবং টেকনাফ স্টেশন থেকে টমটম/ সিএনজি জনপ্রতি ভাড়া ২০ টাকা।

খাওয়া-থাকার ব্যবস্থা:
সৈকতের পাশে আপাতত ভালো কোন খাবারের দোকান নেই। তবে টেকনাফ মূল শহরে খাওয়া-দাওয়ার সুন্দর ব্যবস্থা রয়েছে।
বিচের নিকটে সেন্ট্রাল রিসোর্ট এবং আলো রিসোর্ট নামে দু’টি আবাসিক হোটেল রয়েছে। পাশাপাশি মূল শহরেও আবাসিক হোটেলের সু-ব্যবস্থা রয়েছে।

টেকনাফ
চিত্র : টেকনাফ

পরিশেষে এইটাই বলব, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অবসর বিনোদনের জন্য প্রায় অনেকেই কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিনে যান। তাদের অনেকেই জানেন না এই সৈকতটির কথা। নিরিবিলি একান্ত সময় কাটানোর জন্য এমন সুন্দর জায়গা বাংলাদেশে আদৌ আছে কি-না সন্দেহ!

লেখক-
আমিনুল বাঁধন
বি.এ, এম.এ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here