১ দশকে ‘ প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’

181

আগামীকাল ০১ নভেম্বর, ২০২০ খ্রি. ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’ ১ দশক পূর্ণ করতে যাচ্ছে। শুভ্রোজ্জ্বল শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা প্রিয় সংগঠনের প্রতি। আজকে আমি যে সংগঠনটি সম্পর্কে দুকলম লিখতে চাইছি, সে সংগঠনের পীঠস্থান হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয় ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বৃটিশ তাড়াবার ঠিক ১ বছর পূর্বে ১৯৪৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়া একটি ৭৪ বছরের ঐতিহ্যমন্ডিত পাঠশালা। কিছুবছর পূর্বে একজন ইতিহাস সচেতন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের সাথে আড্ডাচ্ছলে যখন জানতে পারলাম পল্লিকবি জসীমউদ্দীন ১৯৪৬ সালে বেড়া আর ছনের চাউনির ভাঙাচোরা দোচালা ঘরটিতে ‘হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামের প্রতিষ্ঠানটির ভিত্তিপ্রস্তরস্থাপন করেছিলেন। কথাটি শুনে আমি তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম। আমি বিশ্বাসের মন্দিরে আরেকটু সিমেন্ট ঢালার জন্য পাল্টা প্রশ্ন করে আবারও জানতে চাইলাম কী বলুন আপনি। তিনি সাবলীলভাবে আবারও বললেন। হ্যাঁ, তৎকালীন পানখালী রেঞ্জার অফিসে জসীমউদ্দিনের এক আত্মীয় চাকুরি করতেন। বস্তুত জসীমউদ্দিন তাঁর কাছে বেড়াতে এসেছিলেন। এ মোক্ষম সুযোগটি কাজে লাগিয়েছিলেন হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মহাত্মাগণ। তিনার র্যাশনাল স্টেটমেন্ট শুনে আমার বুকে এক চিলতে আনন্দ আর গর্বের মধুরেখা বয়ে গিয়েছিলো। তা আজও বহমান। এছাড়া এ শিক্ষালয় থেকে পাঠ নিয়ে বহুজন গুণীজনের তকমা লাগিয়ে দেশ বিদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ নানা সেক্টরে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন বেশ সুনামের সাথে। আসছে বছর ৭৫ বছরে পা রাখছে টেকনাফ উপজেলার প্রাচীনতম মাধ্যমিক স্কুল হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়। আশা রাখি বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষক ও সাবেক-বর্তমান স্টুডেন্ট মিলে প্লাটিনাম জয়ন্তী বা ৭৫ বছর পূর্তি উদযাপন করে টেকনাফ তথা দেশের শিক্ষাঙ্গণে একটি ইস্পাত-দৃঢ় বন্ধনের জানান দিবে। এবং সাবেক বর্তমানের চাঁদের হাট বসবে প্রিয় হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। আমি প্রত্যয় ব্যক্ত করছি ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’ এখানটায় হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে দৃঢ়ভাবে কাজ করবে। সাধারণ সেন্সে আমরা বুঝি অ্যালামনাই এসোসিয়েশন বা প্রাক্তন স্টুডেন্টদের সংগঠন বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের কর্মধারায় সারথি হিসেবে পাশে থাকে। অর্থাৎ অ্যালামনাই এসোসিয়েশন মানেই একটি সহযোগী সত্তা। অক্সালিয়ারি ভার্ব। এটি প্রতিষ্ঠানের সুখে দুখে আপদে বিপদে লেপ্টে থেকে প্রতিষ্ঠানের চলার পথকে মসৃণ করে শ্রীবৃদ্ধি ঘটায়। ইনস্টিটিউশনের সাথে অ্যালামনাইদের পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাস এটুকুনই। এর বাইরে সমাজ হিতকর কাজকর্ম তারা নিজের গরজে করে থাকে। সামাজিক অবক্ষয়/নীতিনৈতিকতা মূল্যবোধের অধোগতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, ঝড়ে পড়া শিক্ষার্থী রোধ, মননশীলতা ও সৃজনশীলতায় উদ্বুদ্ধকরণসহ নানাবিধ সোস্যাল কালচারাল কল্যাণমূলক কাজ প্রাক্তন স্টুডেন্টস্ দ্বারা হতে পারে। এসবকিছু মাথায় মগজে রেখে ২০১০ সনের ০১ নভেম্বর এক স্বপ্ন বুননের রৌদ্রময় সকালে কিছু স্বপ্নচারী মানুষের(বর্তমান সভাপতি আলাউদ্দিন আহমেদ রাসেল, সহসভাপতি মুহাম্মদ ইউসুফ, সহসভাপতি তারেক মাহমুদ রনি এবং আমিসহ আরও দুএকজন মানুষের নামোল্লেখ না করলে ভীষণ কার্পণ্য করা হবে। উল্লিখিত ৪ জনই মূলত চট্টগ্রামে বসে ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’ গঠন কল্পে একটি রূপরেখা প্রণয়ন করেন।) জিয়নকাঠির ছোঁয়ায় আত্মপ্রকাশ ঘটে ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামের অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের। দীর্ঘ ১ দশক বন্ধুর পথ মাড়িয়ে ঘাত, প্রতিঘাত, অভিঘাত ও সাফল্য-ব্যর্থতার বোঝা মাথায় নিয়ে আজকের ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’।
এবার ১০ বছর পথচলার কিছু অম্লমধুর হিসেবনিকেশ কষা যাক। ১০ বছরের এ পথচলা নিশ্চয় তেজি ঘোড়ার মতোন টগবগিয়ে ছিলো না। বলা চলে খুড়িয়ে খুড়িয়ে ১০ বছরের জার্নি মোটেও সুখকর নয়। বরং অনেক ত্যক্তবিরক্ত অভিজ্ঞতার ঘানি টেনেছেন সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দ। তারপরও মেঘের আড়ালে কিয়ং আলো ছড়ানোর কথা ১০ বছর পূর্তিতে আমি আলোকপাত করতে চাই। নেতিবাচক ঘ্যানঘ্যানানির বাইরে কিছু ইতিবাচক ইতিবৃত্ত তো জানুক সবাই।
বলাবাহুল্য ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’ এ ১ দশকে দুটো কার্যকরী কমিটি দ্বারা পরিচালিত হয়। প্রথম গঠিত কমিটি(ইলেকশন নয় সিলেকশন) টানা ৭ বছর দায়িত্বে থেকেছে। দ্বিতীয় কমিটি(সিলেকশন) ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ দায়িত্ব নেওয়ার পর এখনও বলবৎ আছে। কমিটি অবশ্য ২ বছরের জন্য নির্বাচিত হলেও যথাসময়ে নতুন কমিটি গঠন কোনোকালেই হয়নি। এটি অবশ্য কোনো সংগঠনের জন্য মঙ্গলকর নয়। তবে এ ১০ বছরে কিছু রুটিনমাফিক কাজ হয়েছে চোখে পড়ার মতোন। বাৎসরিক মিলনমেলা, রমযান কেন্দ্রিক ইফতার মাহফিল, কৃতী শিক্ষার্থী সংবর্ধনা, হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রয়াত শিক্ষকগণের স্মরণে নাগরিক শোকসভা, ২০১২ সালের রাঙামাটি ট্যুর এবং জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানগুলোতে বিদ্যালয়ের সাথে একাত্মবোধ হয়ে অংশগ্রহণ(দুএকবার এদিকওদিক হলেও মোটামুটিরকম হয়েছে)। এছাড়া মাদকবিরোধী র্যালি, ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা ইনফ্লাক্সে নির্যাতিত বুভুক্ষু মানুষগুলোকে পারতপক্ষে সহযোগিতার হাত বাড়ানো, রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক সেমিনার, অসুস্থ শিক্ষকদের সাহায্যে চিকিৎসা তহবিল গঠন, ১৯৪৬-২০২০ পর্যন্ত প্রাক্তন স্টুডেন্টদের ডাটাবেইজ তৈরির কাজ শুরু, সংবিধান প্রণয়ন, স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সাথে নেগোসিয়েশন করে পরিষদের জন্য একটি রুম বরাদ্দ নেয়া ইত্যাদি কাজগুলো অর্জনের খাতায় অবশ্যই লিপিবদ্ধযোগ্য। অপ্রাপ্তির খতিয়ান বহু হতে পারে। তাও অবশ্য আমলযোগ্য। এরপরও আমি বলবো, আমার নাগালের মধ্যে ফুলের বাগান থাকতে কোন দুঃখে নর্দমার গন্ধ শুঁকতে যাবো! বস্তুতপক্ষে এ কালচারটি আমাদের সমাজে অনেকটা ট্রেন্ড হিসেবে পরিণত হয়েছে। খারাপটাকে সামনে এনে টানাহেঁচড়া করে অস্বস্তিকর গন্ধে আশপাশ জ্যাম করে রাখি আমরা। রাতারাতি সবকিছুর আমূল-পরিবর্তন এক অর্থে ভালো কিছু বয়ে আনে না। ইতিহাসের শিক্ষাই হলো সুকৌশলে ধীরেসুস্থে এগুনো বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’ এর বর্তমান সেক্রেটারি হিসেবে আমি হলফ করে বলতে পারি, কখনও নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করবার প্রয়াসে এ সংগঠনের দায়িত্বে আসিনি এবং সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কোথাও আলতোফালতু কাজও করিনি। এবং তা করবার কিঞ্চিৎ সুযোগও নেই। ইত্যবসরে আমাদের ৩১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির কেউ করেছেন কিনা তাও আমার দৃষ্টিগোচর হইনি। সামগ্রিক চিন্তাভাবনা নিয়ে সংগঠন অগ্রসরমান হোক, সবসময় তা চেয়েছি আমরা। সাদা চোখে প্রতীয়মান এটি কোনো লাভজনক সংগঠন নয় যে, এখানে কারোর খারাপ ইনটেনশান থাকতে পারে। বরং পকেটের পয়সা খরচা করে এ টাইপের সোস্যাল সংগঠনগুলো ফুয়েল দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়।
কনস্ট্রাক্টিভ ক্রিটিসিজম গণতন্ত্রের বিউটি। কোনো সংগঠনের জন্যও গঠনমূলক সমালোচনা মাস্ট। এটি যেমন সবার ভেতরে ধারণ করা জরুরি, তেমনিভাবে মেরিটলেস অবিবেচনাপ্রসূত সমালোচনা কোনো অর্থে মঙ্গল বয়ে আনে না। বরং বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ না করা সাবেক স্টুডেন্ট সংগঠনের ভাইটাল দায়িত্বে এসেছেন। এ বিষয়টি সমালোচনার চোখে দেখেন। আশা করছি প্রকাশিতব্য সংবিধানে সমালোচনার এ বিষয়টির ধোঁয়াশা কেটে যাবে। সংবিধানের ধারা উপধারা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নিরিখে ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’ অনন্তকাল বেঁচে থাকবে। চিরাচরিতভাবে নতুন নতুন নেতৃত্ব আসবেন, যাবেন। সংগঠন তার আপন মহিমায় আলোক-উৎসারী হয়ে থাকবে।
জয়তু ‘প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়’।

 

লেখক — এহ্সান উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক, প্রাক্তন ছাত্র পরিষদ হ্নীলা উচ্চ বিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here